দেশি জাতের পেঁয়াজের বাম্পার ফলনে খুশি কৃষকরা
নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজবাড়ীতে দেশি জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের বাম্পার ফলন খুশি কৃষকরা । তবে বাজারে দাম কম থাকায় চাষিরা দুশ্চিন্তায় আছেন। পেঁয়াজের দাম মণ প্রতি ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা হলে জেলার চাষিরা লাভবান হবেন বলে জানিয়েছেন।
বর্তমানে জেলায় প্রতি মণ মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে ১২০০ টাকায়। অথচ গত বছরও যার দাম ছিল ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত। আগের বছরগুলোতে আগাম মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হলেও এবারের চিত্রটা উল্টো। বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় পেঁয়াজ আবাদে বাড়তি খরচের চাপ পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের স্বার্থে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন চাষিরা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের তোরাপ শেখের পাড়া এলাকার কৃষি উদ্যোক্তা হুমায়ুন আহমেদ বলেন, কিছু দিন আগে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তিন একর জমির পেঁয়াজ ডুবে যায়। পরে সেই জায়গায়ও আবার পেঁয়াজ লাগাতে হয়েছে। চলতি বছর ১৫ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছি। প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ হাজার টাকা। আর বিঘা প্রতি ফলন পেয়েছেন ৭৫-৮০ মণ। কিন্তু বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় হতাশ। তাই পেঁয়াজের ভরা মৌসুমে কৃষকদের স্বার্থে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধের দাবি জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে পেঁয়াজের দাম কম। প্রথমদিকে মণ প্রতি ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকা পাওয়া গেলেও সরবরাহ বাড়ায় দাম কমে গেছে। প্রতি বিঘায় মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদে খরচ হয়েছে ৪০-৪৫ হাজার টাকা। উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ২৫ শতাংশ নষ্ট হয়। ফলে বিঘাপ্রতি পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে ৫০ হাজার টাকার মতো। এই পেঁয়াজ বিক্রির টাকা দিয়ে পরেরবার আবাদ শুরু করি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় বেশি দামে বীজ ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে চারা পেঁয়াজ আবাদ করতে হচ্ছে।
হুমায়ুন আহমেদের মতো একই অবস্থা রাজবাড়ীর অন্যান্য পেঁয়াজ চাষির। আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম নিয়ে হতাশায় ভুগছেন তারা। চারা পেঁয়াজ বাজারে আসার আগে মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষ করে গত কয়েক বছর লাভ পেলেও এবার দাম কম হওয়ায় হতাশ দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল রাজবাড়ীর চাষিরা।
রাজবাড়ী কালুখালীর আরেক পেঁয়াজ চাষি ইয়াকুব আলী বলেন, গত বছর ঘরে বীজ ছিল। এ বছর বীজ কিনতে হয়েছে। গত বছর এক কেজি বীজ পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে কেনা গেলেও এ বছর স্থানীয় জাতের বীজের কেজি কিনতে হচ্ছে ৭/৮ হাজার টাকায়। হাইব্রিড পেঁয়াজের বীজ কিনতে গুনতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকার বেশি।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা সালাম মৃধা বলেন, গত বছর মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম ভালো ছিল। এ আশায় এবার ছয় বিঘায় পেঁয়াজ লাগিয়েছিলাম। হাটে পেঁয়াজ এনে হতাশ। ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে বাজারদর কমিয়ে পেঁয়াজ কিনে ঢাকায় নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে মুনাফা অর্জন করছেন।
আড়তদাররা জানান, গত বছরের চেয়ে এবার বাজারে মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বেশি। প্রথম দিকে চাষিরা কিছুটা লাভবান হলেও ক্রমেই দাম কমছে। এভাবে দাম কমতে থাকলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
অনেক চাষির অভিযোগ, পেঁয়াজের ব্যাপারীরা তাদের ঠকাচ্ছেন। ব্যাপারীরা দাম করে পেঁয়াজ কেনার পরও আড়তে নিয়ে দাম কম দেন। প্রতিবাদ করলে তারা মারমুখী আচরণ করেন।
পেঁয়াজ ক্ষেতে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ দুঃখের স্বরে জানান, দাম একটু বাড়লেই কথা ওঠে। কিন্তু দাম কমে গেলে কেউ চাষিদের খবর নেন না।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এস এম শহীদ নুর আকবর জানান, রাজবাড়ীতে চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৪ হাজার একর। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছিল। ২০২২-২৩ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৩৫ হাজার একর। তবে এখন পর্যন্ত কী পরিমাণ পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে, সঠিক বলা যাচ্ছে না। কারণ এখন পর্যন্ত অনেক চাষি আবাদ করছেন।
তিনি আরও বলেন, জেলার গোয়ালন্দ ও বালিয়াকান্দি উপজেলায় বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে গোয়ালন্দ উপজেলা মুড়িকাটা পেঁয়াজ এবং বালিয়াকান্দি উপজেলায় হালি পেঁয়াজ বেশি হয়। তবে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের এ ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। তবে ভালো ফলনের আশা করছি।
