গুলশানের সেই স্পা সেন্টারে তরুণীদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হতো
প্রতীকী ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৪৭ রোডের ২৫ নম্বর আবাসিক ভবনে স্পা সেন্টারে অভিযান চালানোর ঘটনায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানায় মামলাটি করা হয়।
মামলায় স্পা সেন্টারের মালিক, ব্যবস্থাপক ও স্পা সেন্টারের ফ্ল্যাটের মালিককে আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও ডিএনসিসির অভিযানে আটক সাত নারীর বিরুদ্ধে দেহ ব্যবসা করার অভিযোগে ডিএমপির অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রসিকিউশন ইউনিটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মামলার এজাহারে বাদী অভিযোগ করেন, গতকাল বুধবার (১১ জানুয়ারি) দুপুর ৩টায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছিল। অভিযানে ৪৭ নম্বর সড়কে বিভিন্ন আবাসিক ভবন হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার পরও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানসমূহের ট্রেড লাইসেন্স যাচাই করা হয়। এর অংশ হিসেবে গুলশান ২৫ নম্বর বাড়ির ৪র্থ তলায় যাওয়ার পর ৪-ডি ফ্ল্যাট বন্ধ পাওয়া যায়। তখন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমাদুল হাসানের নেতৃত্বে ফ্ল্যাটটিতে প্রবেশ করে উপস্থিত ব্যক্তিদের অসংলগ্ন অবস্থায় দেখতে পান।
সেখানে উপস্থিত ৯ জনকে আটক করলে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানান, পলাতক আসামি হাসানুজ্জামান, তার স্ত্রী শাহিনুর আক্তার পায়েল ও বাড়ির মালিক এ.টি এম মাহবুবুল আলম পরস্পর যোগসাজশে ‘অল দ্যা বেস্ট স্পা’ নামে এটি পরিচালনা করে আসছিলেন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণীদের সংগ্রহ করে এখানে এনে অবৈধ দেহ ব্যবসায় বাধ্য করতেন।
ভবনটি আবাসিক হারে হোল্ডিং ট্যাক্স প্রদান করলেও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবহৃত হচ্ছিল। ফলে ডিএনসিসি রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা পরিচালনা করায় তা আইনত অবৈধ বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
এজাহারে মামলার বাদী আরও বলেন, বেলা ৩টার দিকে ভবনের পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাটের লোকজন এসে জানায় ২ জন নারী ভবনের নিচে পড়ে আছেন। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি গুলশান থানা পুলিশকে জানালে বেলা ৩টা ২০ মিনিটে দুই নারীকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে একজন মারা যান এবং আরেকজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, স্পা সেন্টারে কাজ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে তরুণীদের সংগ্রহ করতেন আসামিরা। এরপর তাদের পতিতাবৃত্তি ও অসামাজিক কাজে বাধ্য করা হতো।
এদিকে গতকাল ‘অল দ্যা বেস্ট স্পা’ সেন্টার থেকে আটক ৯ জনকে পাঁচশত টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে পাঁচ দিনের কারাদণ্ডের আদেশ দেন ডিএনসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত। পরে আজ তারা জরিমানার ৫০০ টাকা পরিশোধ করে সিএমএম আদালতের হাজতখানা থেকে মুক্ত হন।
সিএমএম আদালতের হাজত খানার ইনচার্জ শহীদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ডিএমপি অধ্যাদেশের ৭৪ ধারায় অপরাধ করায় তাদের একই অধ্যাদেশের ১০০ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে পুলিশ।
গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসিব বলেন, মামলার আসামিরা এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এই পতিতালয় চালানোর যে অভিযোগ আনা হয়েছে এতে আসামিদের সঙ্গে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি-না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) সকালে গুলশান থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) হাসিব মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গুলশানের স্পা সেন্টারে অভিযানের ঘটনায় ডিএনসিসির প্রসিকিউশন অফিসার (অঞ্চল-৩) আব্দুস সালাম বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় তিন জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ আনা হয়— অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে অনৈতিক উপায়ে লাভবান হওয়ার জন্য পতিতালয় চালাচ্ছিল। মামলাটি আমরা তদন্ত করছি। এছাড়া ডিএনসিসির অভিযানে আটক সাত নারীকে পতিতাবৃত্তিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ডিএমপির অধ্যাদেশ অনুযায়ী প্রসিকিউশন ইউনিটের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
স্পা সেন্টার থেকে লাফিয়ে পড়ে নিহত ফারজানা আক্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে এসআই হাসিব বলেন, ফারজানা আক্তারের মৃত্যুর বিষয়টি অপমৃত্যু হিসেবে রেজিস্টার হয়েছে। আমরা এখন তদন্ত করে দেখব আসলে তার মৃত্যুর কারণ কী। এছাড়া আমরা তদন্তে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করব সে আসলে কীভাবে মারা গেছে।
মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে খোঁজ খবর নিয়েছি, মামলার আসামিরা এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া পতিতালয় চালানোর যে অভিযোগ আনা হয়েছে এতে আসামিদের সঙ্গে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না তা আমরা তদন্ত করে দেখছি।
ইশরাত নামে এক নারী স্পা সেন্টারটির ফ্ল্যাটের মালিক বলে জানা গেছে। কিন্তু ডিএনসিসির অভিযোগে ফ্ল্যাটটির মালিক এটিএম মাহাবুবুল আলম বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে করা হলে তিনি বলেন, আমরা এ বিষয়ে তদন্ত করছি। ফ্ল্যাটটির মালিক আরও কেউ আছেন কি না বা ফ্ল্যাটের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে কি না জানার চেষ্টা করছি।
বুধবার (১১ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৪৭ রোডের ২৫ নম্বর আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এমন তথ্য ভিত্তিতে অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি)। অভিযান চলাকালে ভবনটির ৪ তলায় থাকা একটি স্পা সেন্টারের দুই কর্মী পালিয়ে যাওয়ার জন্য লাফ দেন। এতে ফারজানা আক্তার (১৯) নামে এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে, আরেকজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
আমাদেরকাগজ/এইচএম
